রমজানেও সিলেটে কাটেনি এলপি গ্যাস সংকট

টানা ২ মাসেও স্বাভাবিক হয়নি এলপি গ্যাসের (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) বাজার। রমজানেও কাটেনি সংকট। ফলে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। ১৩৫৩ টাকার সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে অতিরিক্ত দামে ১৮০০-২০০০ টাকায়। কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলতে পারছে না কেউ। এতে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ।
তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এলপি গ্যাসের সংকট শিগগিরই কাটছে না। পবিত্র রমজান মাস শুরুর আগে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। উল্টো আমদানি কমেছে। এক মাসের ব্যবধানে কমার পরিমাণ ২১ হাজার টন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ২৬ হাজার টন। সরবরাহ স্বাভাবিক করতে জানুয়ারিতে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ টন এলপিজি আমদানির কথা ছিল। আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার টন। ফেব্রুয়ারিতে আমদানি কিছুটা বাড়তে পারে। আমদানিকারকেরা বলছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক হতে মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
নগরীর কয়েকজন খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, রমজান মাস শুরু হলেও গ্যাসের সংকট এখনো কাটেনি। চাহিদামতো পাওয়া যায় না। এখনো ৫০ শতাংশ চাহিদার ঘাটতি রয়েছে। তাই নির্ধারিত দামে ১ হাজার ৩৫৬ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। শুধু খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা নয়, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলাতেও বেশি দাম ছাড়া মিলছে না না এলপি গ্যাস।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান না থাকায় সিন্ডিকেটচক্র মিলেমিশে ভোক্তাদের পকেট কাটছে। সিলেটের বিভিন্ন ডিলারের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, এখনো সংকট কাটেনি। এখানে-সেখানে ঘুরেও চাহিদামতো পাওয়া যায় না। আবার কিছু পাওয়া গেলেও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
সিলেটের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ডিলারের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, প্রায় ২ মাস হতে যাচ্ছে, এখনো ঠিকমতো এলপি গ্যাস পাওয়া যায় না। ১২ কোজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। বেশি দামে কেনা। তাই নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব না। ৩৫ কেজির সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কেউ বলতে পারে না। এতে আমাদেরও খারাপ লাগছে।
ডিলাররা জানান, আগের মতো গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। ১২ কেজির সিলিন্ডার পাইকারি ১ হাজার ৫০০ টাকায় কেনা হলো। তা ১ হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রি করা হবে। খুচরা বিক্রেতারা নিয়ে তারাও কিছু লাভ করে বিক্রি করবে। এতে ১৭০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। খুচরা বিক্রেতারাও জানান, ঠিকমতো পাওয়া যায় না। মাঝে গ্যাপ দিয়ে পাওয়া যাচ্ছে। গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে সংকট শুরু হয়েছে। তারা আগে পরিবহন বাবদ কমিশন দিত। কিন্তু গত মাস থেকে আর দিচ্ছে না। এজন্য নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫৬ টাকা দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
লোয়াব ও বিইআরসি থেকে জানা যায়, দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে ১৬ থেকে ১৭ লাখ টন। দিনে কম-বেশি ৫ হাজার টন এলপিজি লাগে। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা তা বিক্রি করেন। ভোক্তা পর্যায়ে বেসরকারি খাতের এলপিজি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম সরকার জানুয়ারিতে নির্ধারণ করে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। গত মাসে এর দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ২৫৩ টাকা; অর্থাৎ জানুয়ারিতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা। কিন্তু সেই দামে মেলে না। তবে ভোক্তাদের দাবি, নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এলপি গ্যাসের বাজার যেন নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক করা হয়। কারণ শহরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এই গ্যাস রান্নার কাজে ব্যবহার হচ্ছে।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র বলছে, দেশে ২৮টি কোম্পানি এলপিজির ব্যবসা করে। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানির আমদানির অনুমোদন আছে। তবে এখন ৫ থেকে ৬টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারছে। অন্যদের বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি করতে দিচ্ছে না। এজন্য আগের মতো আমদানি স্বাভাবিক হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে সিলেটের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এলপি গ্যাস সরবরাহকারী ডিলার মেসার্স কামাল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. কামাল হোসেন বলেন, এখনো স্বাভাবিক হয়নি সরবরাহ। তবে আগে থেকে কিছুটা বেড়েছে। এরপরও চাহিদার অর্ধেক গ্যাস মিলছে। আমরা সীমিত লাভে বিক্রি করলেও খুচরা বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করে। আর এর দায় এসে আমাদের ওপরে পড়ে। আমরা খুচরা বিক্রেতাদের বলে দিয়েছি সীমিত আয় করে সিলিন্ডার বিক্রি করতে। অন্যথায় তাদের সিলিন্ডার না দেওয়ারও হুমকি দিয়েছি। কিন্তু এতে কাজ হচ্ছে না। হোম ডেলিভারির নামে খুচরা বিক্রেতারা গ্রাহককে অনেকটা জিম্মি করে ফেলেছে।
তিনি বলেন, রমজান মাসে এই সংকট শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে আগামী মার্চ মাসে সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তখন দামও সহনীয় হবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সিলেট জেলার সহকারী পরিচালক দেবানন্দ সিনহা বলেন, ‘বাজার মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে। যদিও এখনো সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। আগেও অভিযানে জরিমানা করা হয়েছে।’



