বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কৌতূহলোদ্দীপক এবং জটিল অধ্যায় হলো বাংলাদেশ জাতীয়তা-বাদী দলের (বিএনপি) রাজনৈতিক পরিক্রমা। দলটির বিশাল জনসমর্থন এবং আপামর জনসাধারণের মধ্যে তাদের ভোটের রাজনীতি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই ও তীব্র গণ-আন্দোলনের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ক্ষমতায় আরোহণের এই আনন্দঘন মুহূর্তেই একটি মৌলিক প্রশ্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজতাত্ত্বিকদের ভাবিয়ে তুলছে কেন এই বিপুল জনভিত্তি থাকা সত্ত্বেও দলটি ঐতিহাসিকভাবে এক মেয়াদের বেশি ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল নির্বাচনী রাজনীতির হিসাব মেলালে চলবে না, বরং দলটির আদর্শিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংগঠনিক কাঠামোর গভীরে
ক্ষমতায় আসার পর দলটির নীতিনির্ধারকদের প্রথম এবং প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত যে, এই ভূমিধস বিজয় বা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানেই যা খুশি তা করার অধিকার বা ম্যান্ডেট পেয়ে যাওয়া নয়। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তাদের গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি যে, বিগত সরকারের মতো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটালে জাতি আবারো এক ভয়াবহ প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিপুলসংখ্যক অধ্যাদেশের (যার মধ্যে ১৩৩টি অধ্যাদেশের যৌক্তিক সুরাহার বিষয়টি চলমান) একটি টেকসই ও গণতান্ত্রিক সমাধান তাদের বের করতে হবে। নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ চার বছর নাকি পাঁচ বছর হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে কথা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে বিএনপি পাঁচ বছরের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে; তাদের যুক্তি হলো স্বল্প সময়ে নির্বাচন দিলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়ে। কিন্তু এই দাবিকে জনগণের কাছে যৌক্তিক প্রমাণ করতে হলে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)কে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করার মতো কাঠামোগত সংস্কারগুলোতে তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে একটি কার্যকর ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারলে ক্ষমতার অন্ধ অহমিকা তাদের দ্রুতই জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে।
বিএনপি’র দীর্ঘস্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারার পেছনে অন্যতম প্রধান একটি কারণ হলো তাদের মতাদর্শিক স্থবিরতা। বিএনপি’র রাজনীতির মূল ভিত্তি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে আধুনিকীকরণ করতে পারেনি। বর্তমান বিশ্বায়ন এবং বহু সংস্কৃতির যুগে একটি রাষ্ট্রকে কেবল পরিচয়ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দিয়ে ঐক্যবদ্ধ রাখা কঠিন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বিভক্তি দূর করে একটি প্রগতিশীল সমাজ গড়তে ‘নাগরিক জাতীয়তাবাদ’ বা সিভিক ন্যাশনালিজম-এর দিকে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন, যা নাগরিকত্বের সাম্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। কিন্তু বিএনপি তাদের দলীয় দর্শনকে এই আধুনিক নাগরিক জাতীয়তাবাদের সমান্তরালে বিকশিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, ফলে তাদের রাজনৈতিক আখ্যান প্রায়শই একটি নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যে আটকে থাকে এবং বৃহত্তর উদারনৈতিক জনগোষ্ঠীর কাছে আবেদন হারায়।
সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ‘হেজিমনি’ বা আধিপত্য নির্মাণে ঐতিহাসিক ব্যর্থতা দলটির জন্য এক অশনিসংকেত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রাচীন বাংলার পুণ্ড্রবর্ধন থেকে শুরু করে চর্যাপদের সাংগীতিক ঐতিহ্য এবং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের লোকজ সাংস্কৃতিক ভিত্তির সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শনকে একীভূত করতে সক্ষম হয়েছে। অথচ জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এবং ১৯৭৮ সালে জাসাস প্রতিষ্ঠা করে যে সাংস্কৃতিক জাগরণের বীজ বপন করেছিলেন, পরবর্তী নেতৃত্ব তা ধরে রাখতে পারেনি। দলটির সাংস্কৃতিক বলয় জাসাস বর্তমানে কেবল দলীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন, শহীদ মিনারে ফুল দেয়া এবং গুটিকয়েক আলোচনা সভার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। জাতীয় মনন গঠনে, বুদ্ধিবৃত্তিক সাহিত্য রচনায় বা প্রগতিশীল শিল্পী, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের সঙ্গে মেলবন্ধন তৈরিতে দলটির চরম অনীহা সমাজে তাদের একটি বিশাল সাংস্কৃতিক শূন্যতার মধ্যে ফেলে রেখেছে।
