নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর | বিজ্ঞানচিন্তা চন্দ্রশেখর

চন্দ্রশেখর আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রয়োগ করে দেখলেন, ভরের তুলনায় শ্বেত–বামনের ঘনত্ব ফাওলারের হিসাবের তুলনায় আরও অনেক বেড়ে যায়। ভর বৃদ্ধির সঙ্গে ঘনত্বের দ্রুত বৃদ্ধিই শুধু হয় না, একটা নির্দিষ্ট ভরের বেশি হলে ঘনত্বের পরিমাণ হয়ে যায় অসীম। ভরের এই নির্দিষ্ট সীমাই পরে ‘চন্দ্রশেখর লিমিট’ হিসেবে গৃহীত হয়। ভরের এই সীমা নক্ষত্রের রাসায়নিক উপাদানের ওপর নির্ভর করে।

চন্দ্রশেখর জাহাজে বসে ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর আগেই লিখে শেষ করলেন তাঁর পেপার ‘দ্য ম্যাক্সিমাম মাস অব আইডিয়েল হোয়াইট ডোয়ার্ফ’। তিনি হিসাব করে দেখিয়েছিলেন যে কোনো শ্বেত–বামনের ভর সূর্যের ভরের ৯০ শতাংশের বেশি হলে তার ঘনত্ব অসীম হয়ে যাবে। পরে অবশ্য এই মান কিছুটা পরিবর্তিত হয়। বর্তমানে চন্দ্রশেখর লিমিট হলো সূর্যের ভরের ১.৪ গুণ।

এর ৫৩ বছর পর ১৯৮৩ সালে চন্দ্রশেখর নোবেল পুরস্কার পান এই কাজের জন্য, যা তিনি করেছিলেন মাত্র ১৯ বছর বয়সে ভারত থেকে ইংল্যান্ড যাওয়ার পথে জাহাজে বসে।

কেমব্রিজে গিয়ে প্রফেসর ফাওলারের সঙ্গে দেখা করলেন চন্দ্রশেখর। ফাওলারের সঙ্গে দেখা করেই তিনি নতুন লেখা পেপার দুটি দেখালেন। প্রথম পেপার, যেটাতে ফাওলারের কাজ বিস্তৃত করা হয়েছে, তা খুশি মনে মেনে নিলেন ফাওলার এবং রয়্যাল সোসাইটির প্রসিডিংসে প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় পেপার যেটাতে চন্দ্রশেখর ভরের সীমা হিসাব করেছেন, সেটা নিয়ে ফাওলার দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লেন। ফাওলার বললেন পেপারটা এডওয়ার্ড মিলনির কাছে পাঠিয়ে মতামত নিতে। কিন্তু কয়েক মাস পরও ফাওলার বা মিলনির কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না পেপারটির ব্যাপারে। চন্দ্রশেখর বুঝতে পারলেন যে ফাওলার হয়তো চাচ্ছেন না যে পেপারটি এখন প্রকাশিত হোক। চন্দ্রশেখর আর অপেক্ষা করলেন না। পেপারটির ছোট একটা সংস্করণ (মাত্র দুই পৃষ্ঠা) পাঠিয়ে দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালে। পরের বছর অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল-এ প্রকাশিত হলো চন্দ্রশেখরের বিখ্যাত গবেষণাপত্র—দ্য ম্যাক্সিমাম মাস অব আইডিয়েল হোয়াইট ডোয়ার্ফ (অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল, (১৯৩১) সংখ্যা ৭৪, পৃ. ৮১-৮২)।

রিলেটিভিস্টিক আয়োনাইজেশন ও মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করে ১৯৩৩ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করলেন চন্দ্রশেখর। এরপর ট্রিনিটি কলেজের ফেলোশিপ পেলেন। রামানুজনের পরে চন্দ্রশেখরই হলেন দ্বিতীয় ভারতীয়, যিনি এই ফেলোশিপ পেলেন। ১৯৩৪ সালের মধ্যে রিলেটিভিস্টিক কোয়ান্টাম মেকানিকসের আলোকে শ্বেত–বামনের ভর ও ঘনত্বের সীমা নিয়ে বিস্তারিত হিসাবসহ দুটি পেপার প্রকাশের জন্য রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিতে জমা দিলেন। রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির আমন্ত্রণে ১৯৩৫ সালের জানুয়ারি মাসে সোসাইটির মাসিক সভায় বক্তৃতা দেন চন্দ্রশেখর। সভায় উপস্থিত ছিলেন স্যার আর্থার এডিংটন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে সেই সময় এডিংটনের কথাই শেষ কথা। এডিংটন চন্দ্রশেখরের গবেষণাকে স্বীকৃতি তো দিলেনই না; বরং অপমান করলেন। এডিংটনের মতে যে কোনো তারাই শক্তিক্ষয়ের পর একসময় প্রাকৃতিক নিয়মেই মরে যাবে। সেখানে শ্বেত–বামন বা ভরের সীমার কোনো শর্ত থাকতে পারে না।

এর প্রায় দুই যুগ পর চন্দ্রশেখর লিমিট নিজের যোগ্যতাতেই প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় আবিষ্কারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। চন্দ্রশেখরের সীমার চেয়ে বেশি ভরের তারাগুলোর ভবিষ্যৎ কী? এ প্রশ্নের উত্তর সেদিন পাওয়া না গেলেও আজ আমরা সবাই জানি যে এরা ‘নিউট্রন স্টার’ কিংবা ‘ব্ল্যাকহোল’–এ রূপান্তরিত হয়।

এডিংটনের কারণে ইংল্যান্ডের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে গিয়েছিল চন্দ্রশেখরের। ১৯৩৫ সালে তিনি পাড়ি দিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। চার মাস কাজ করলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর যোগ দিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪২ সালে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং ১৯৪৪ সালে ফুল প্রফেসর হন চন্দ্রশেখর। ১৯৫২ সালে ‘মরটন ডি হাল ডিস্টিংগুইসড সার্ভিস প্রফেসর’ হন। ১৯৮৫ সালে অবসর গ্রহণের পরও ইমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে আমৃত্যু শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়েই ছিলেন চন্দ্রশেখর। ৪৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে ৫১ জন গবেষক পিএইচডি ডিগ্রি পান চন্দ্রশেখরের তত্ত্বাবধানে। ১৯৯৫ সালের ২১ আগস্ট চন্দ্রশেখর মারা যান।

লেখক: শিক্ষক গবেষক, আরএমআইটি, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া

সূত্র:

আর জে টেইলর/সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর: বায়োগ্রাফিক্যাল মেমোরিজ অব ফেলোজ অব দ৵ রয়্যাল সোসাইটি (১৯৯৬)

কামেশ্বর সি ওয়ালি/চন্দ্র: আ বায়োগ্রাফিক্যাল পোট্রেট (২০১০),

প্রদীপ দেব/ উপমহাদেশের এগারোজন পদার্থবিজ্ঞানী (২০১৭)

*লেখাটি ২০২২ সালে বিজ্ঞানচিন্তার মে সংখ্যায় প্রকাশিত

বাংলা ম্যাগাজিন /এস পি

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।