আর্নেস্ট রাদারফোর্ড বলে মন্তব্য নিউক্লিয়ার ফিজিকসের স্থপতি ১৯০৯

১৯০৯ সালে আলফা কণার ধর্ম পরীক্ষা করার জন্য রাদারফোর্ড ও মার্সডেন অনেকগুলো ধারাবাহিক পরীক্ষণের ব্যবস্থা করেন। সেই পরীক্ষায় দেখা গেল ইউরেনিয়াম সল্ট থেকে আলফা কণা নির্গত হয়ে বেশির ভাগই পাতলা সোনার পাতের মধ্য দিয়ে বাধাহীনভাবে চলে গেল। কিন্তু কিছু আলফা কণা যেদিক থেকে নির্গত হয়েছে, পাতলা সোনার পাত থেকে সেদিকেই ফিরে এসেছে। এ ঘটনাকে রাদারফোর্ড পরে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘মনে হচ্ছিল একটা ১৫ কেজি ভরের কামানের গোলা একটি টিস্যু পেপারে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসেছে।

এই পরীক্ষণের পর ধারাবাহিকভাবে আরও অনেক পরীক্ষা করেন। তারপর রাদারফোর্ড এই সিদ্ধান্তে আসেন, পরমাণুর কেন্দ্রে আছে অত্যন্ত ঘনীভূত ভর, যা পরে নিউক্লিয়াস হিসেবে পরিচিত হয়। পরমাণুতে নিউক্লিয়াসের উপস্থিতির পর ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াসের ভিত্তিতে ১৯১১ সালে পরমাণুর রাদারফোর্ড মডেল প্রকাশিত হয়। কিন্তু সেখানে ইলেকট্রনগুলো কীভাবে থাকে, সে ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় মডেলটি সংশোধনের দরকার হয়। ১৯১২ সালে নীলস বোর ম্যানচেস্টারে এলেন রাদারফোর্ডের সঙ্গে গবেষণা করার জন্য। নীলস বোর রাদারফোর্ডের সহযোগিতায় আবিষ্কার করেন তাঁর বিখ্যাত বোর মডেল।

১৯১৩ সালে রাদারফোর্ড প্রকাশ করেন তাঁর তৃতীয় বই রেডিওঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্স অ্যান্ড দেয়ার রেডিয়েশনস। ১৯১৪ সালে রাদারফোর্ডকে ব্রিটিশ সরকার নাইট উপাধি দেয়। নাইটহুড অর্জন করার পর তিনি হলেন স্যার রাদারফোর্ড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত রাদারফোর্ড ব্রিটিশ নেভির উদ্ভাবন ও গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করেন।

১৯১৯ সালে জে জে টমসন কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের মাস্টার নিযুক্ত হলে ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের পরিচালক পদ থেকে সরে আসেন। তাঁর সুপারিশে সেই পদে যোগ দেন রাদারফোর্ড। আমৃত্যু ওই পদেই ছিলেন রাদারফোর্ড। ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের দায়িত্ব নিয়ে তিনি তাঁর ছাত্র জেমস চ্যাডউইকের সঙ্গে গবেষণা শুরু করেন। ১৯১৯ সালে তিনি প্রোটন আবিষ্কার করেন। তাঁর ও চ্যাডউইকের দীর্ঘ গবেষণার ফসল নিউট্রন। ১৯২৮ সালে নিউট্রন আবিষ্কৃত হয়। এ জন্য চ্যাডউইক নোবেল পুরস্কার পান ১৯৩৫ সালে।

১৯২৫ সালে রাদারফোর্ডকে যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অর্ডার অব মেরিট’ দেওয়া হয়। ১৯২৫ থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি ছিলেন রাদারফোর্ড। ১৯৩৭ সালে রাদারফোর্ডের চতুর্থ বই দ্য নিউয়ার আলকেমি প্রকাশিত হয়। ওই বছর ১৯ অক্টোবর রাদারফোর্ডের মৃত্যু হয়।

মানুষ হিসেবে খুবই ভালো ছিলেন রাদারফোর্ড। খুব উচ্চ স্বরে কথা বলতেন তিনি। তিনি এত জোরে কথা বলতেন যে অনেক সময় নয়েস সেনসেটিভ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যেত তাঁর ল্যাবে। কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে তিনি কখনো নাক গলাতেন না। এত সম্মাননা পাওয়ার পরেও তাঁর আচরণে কোনো পরিবর্তন হয়নি।

তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর সম্মানে রেডিওঅ্যাকটিভিটির প্রথম একক হিসেবে রাদারফোর্ড গৃহীত হয় ১৯৪৬ সালে। প্রতি সেকেন্ডে ১০ লাখ কণা বিকিরণের হারকে এক রাদারফোর্ড ধরা হয়। ১৯৫৩ সালে এর চেয়ে বড় আরেকটি একক প্রচলন করা হয় মেরি কুরির নামে। এক কুরি হলো সেকেন্ডে ৩৭ বিলিয়ন বিকিরণ। ১৯৭৪ সালে প্রচলন করা হয় বিকিরণের আন্তর্জাতিক একক বেকরেল। প্রতি সেকেন্ডে একটি বিকিরণ হলো বেকরেল। ১৯৭৫ সাল থেকে রাদারফোর্ড একক আর ব্যবহার করা হয় না। ১৯৯৭ সালে ১০৪ প্রোটনবিশিষ্ট পরমাণুর নাম রাখা হয় রাদারফোর্ডিয়াম (Rf)।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, বায়োমেডিকেল ফিজিকস, আরএমআইটি, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া

সূত্র:

১. ওয়ার্ল্ডস বুকস বায়োগ্রাফিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া অব সায়েন্টিস্টস, সপ্তম খণ্ড, ২০০৩।

২. দ্য সায়েন্টিস্ট/ জন গ্রিবিন, র৵ান্ডম হাউস, নিউইয়র্ক ২০০২।

৩. রিমার্কেবল ফিজিসিস্ট/ ইওয়ান জেমস, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৪।

৪. আ ফোর্স অব ন্যাচার: দ্য ফ্রন্টিয়ার জিনিয়াস অব আর্নেস্ট রাদারফোর্ড রিচার্ড রিভস/রিচার্ড রিভস, নরটন অ্যান্ড কোম্পানি, ২০০৮

বাংলা ম্যাগাজিন /এস পি

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।